মহিদুল ইসলাম (শাহীন) খুলনা থেকে: উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি-বাস্তবতা, কৃষকের প্রয়োজন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ের গবেষণা, মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘নতুন ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি)’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন।
গত ৭ অক্টোবর তিনি এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, বটিয়াঘাটা উপজেলার বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রাম পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি প্রযুক্তি গ্রামে চলমান ধানের জাত ও প্রযুক্তির প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মুল্যায়ন, সার ব্যবস্থাপনা, লবণসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে বিভিন্ন লাইন ট্রায়াল, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং বিভিন্ন মাঠভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।
উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি বর্তমানে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব এবং কৃষিশ্রমিক সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী ধানের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও প্রদর্শনী পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে কৃষকের মাঠে যাচাই এবং কৃষকের অভিজ্ঞতাকে গবেষণার অংশে রূপান্তর করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রযুক্তি গ্রাম কাজ করছে। চলতি রোপা আমন ২০২৬ মৌসুমে প্রযুক্তি গ্রামে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, বৈশিষ্ট্যায়ন ও মূল্যায়ন, ব্রি ধান১১২-এর উপযোগী রোপণ দূরত্ব ও চারার সংখ্যা নির্ধারণ এবং পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের উপযোগী লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনে বিভিন্ন লাইন ট্রায়াল, উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই সার ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত বালাই দমন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এর আওতায় বায়ো-কোটেড ইউরিয়া, ইকো-ইঞ্জিনিয়ারিং ও কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাসের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণ, আলোক ফাঁদ, ব্রি নিড়ানি যন্ত্র, শস্য বিন্যাস ও শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এছাড়া চলমান রোপান আমন মওসুমে ব্রি উদ্ভাবিত ৫২টি ধানের জাত নিয়ে রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় পরিবেশে জাতগুলোর অভিযোজনক্ষমতা, বৃদ্ধি ও ফলন সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি নির্বাচন এবং কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
পরিদর্শন কালে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন শ্রমিক সংকট এবং ক্রমবর্ধমান শ্রমমূল্যের বিষয়টি উল্লেখ করে ধান উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সময়মতো কৃষিকাজ সম্পন্ন করা এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের গবেষণার ফলাফল যথাযথভাবে সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
পরিদর্শনের অংশ হিসেবে প্রযুক্তি গ্রামে প্রায় শতাধিক কৃষক- কৃষাণির অংশগ্রহণে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কৃষকেরা ব্রি উদ্ভাবিত নতুন ধানের জাত, লবণ সহিষ্ণু ধান, উন্নত সার ব্যবস্থাপনা এবং বায়ো-কোটেড ইউরিয়ার ব্যবহার সম্পর্কে তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, মাঠে সরাসরি প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখার সুযোগ থাকায় নতুন জাত ও প্রযুক্তি গ্রহণে তাঁদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকদের মতে, প্রযুক্তি গ্রামের কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁরা শুধু নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারছেন না, বরং নিজেদের বাস্তব সমস্যাও বিজ্ঞানীদের কাছে তুলে ধরতে পারছেন। এর ফলে গবেষণা কার্যক্রম আরও বাস্তবমুখী হচ্ছে এবং কৃষকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন,খুলনার প্রধান ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, “বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামের কার্যক্রম গবেষণা, প্রদর্শন এবং কৃষকের অংশগ্রহণকে একসূত্রে যুক্ত করেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলবায়ুগত ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো জাত ও প্রযুক্তি যাচাইয়ের পাশাপাশি কৃষকের অভিজ্ঞতাকেও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।”
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইন বলেন, “অঞ্চলভেদে কৃষির সমস্যা ও সম্ভাবনা ভিন্ন। তাই ভবিষ্যতের কৃষি উন্নয়নে ‘একই প্রযুক্তি সবার জন্য’ ধারণার পরিবর্তে স্থানভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলএসটিডি প্রকল্পের প্রযুক্তি গ্রামগুলো গবেষণা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।”
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা খালিদ হাসান সৌরিভ বলেন, “ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক ধানের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি ইতোমধ্যে এ অঞ্চলের কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা আরও বিস্তৃতভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।” বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, “এলএসটিডি প্রকল্পের এ ধরনের কার্যক্রম অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক ধানের জাত ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।” সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মাঠের সমস্যা চিহ্নিত করে গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষকের মাঠে তার বাস্তব প্রয়োগ—এই সমন্বিত প্রক্রিয়াই ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির ভিত্তি।
