জ্বর কমে গেছে। রোগী হাসছে, পরিবার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ঠিক এই সময়টাই অনেক সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি বর্ষায় ডেঙ্গু আমাদের উদ্বেগের তালিকায় ফিরে আসে, হাসপাতালের শয্যা ভরে ওঠে, ঘরে ঘরে নেমে আসে দুশ্চিন্তা। অথচ এই রোগ ঠেকানোর কার্যকর উপায় আমাদের হাতেই আছে। দরকার সঠিক তথ্য, সচেতনতা আর সম্মিলিত উদ্যোগ।
পরিসংখ্যানের বার্তা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮২,৭৬১ জন, মারা গেছেন ২৫০ জন। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৩,৭৭৪ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। প্রতিটি সংখ্যা একেকটি পরিবারের কষ্টের গল্প। চিকিৎসার ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি আর হাসপাতালের ভোগান্তি মিলিয়ে এর চাপ পড়ছে ব্যক্তি ও সমাজ, দুইয়ের ওপরই।
শত্রু লুকিয়ে আছে ঘরের কোণেই
ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ, যা ছড়ায় সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ে। এই মশার গায়ে সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। অনেকের ধারণা, মশা মানেই নোংরা পানি বা নর্দমা। কিন্তু এডিসের চরিত্র আলাদা। এরা ডিম পাড়ে ফুলের টব, পুরোনো টায়ার, ডাবের খোসা, ভাঙা পাত্র কিংবা এসি ও ফ্রিজের ট্রেতে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে।
আরেকটি তথ্য অনেকের অজানা: এই মশা প্রধানত দিনে কামড়ায়, বিশেষ করে ভোরে ও সন্ধ্যার আগে। তাই শুধু রাতে মশারি টানিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই।
প্রতিরোধ শুরু হোক ঘর থেকে
এডিস ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা। বাসাবাড়ি ও আশপাশে যেন কোথাও পানি জমে না থাকে, তা নিয়মিত দেখতে হবে। পানির ড্রাম, বালতি ও ট্যাংক ঢেকে রাখুন এবং সপ্তাহে অন্তত একবার ঘষে ধুয়ে ফেলুন। কারণ, ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে সাধারণত এক সপ্তাহের মতো সময় লাগে। ছাদ, বারান্দা, কার্নিশ ও নির্মাণাধীন ভবনেও নজর রাখা দরকার, কারণ সামান্য জমা পানিও এডিসের জন্য যথেষ্ট। নিজের সুরক্ষাও সমান জরুরি। দিনে ঘুমালেও মশারি ব্যবহার করুন, জানালা-দরজায় নেট লাগান, মশা-নিরোধক ক্রিম মাখুন এবং হালকা রঙের পূর্ণ হাতা জামা পরুন।
লক্ষণ চিনুন, জটিলতা এড়ান
হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও হাত-পায়ে ব্যথা এবং ত্বকে ফুসকুড়ি ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ। এমন হলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। রোগীকে প্রচুর পানি ও তরল খাবার দিন, পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন। জ্বরের জন্য সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ব্যথানাশক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া উচিত নয়, কারণ এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে:
- তীব্র পেটব্যথা ও বারবার বমি
- নাক, মুখ বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত
- অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা শ্বাসকষ্ট
সবচেয়ে বড় সতর্কতা হলো, জ্বর নেমে গেলেই বিপদ কাটে না। ডেঙ্গুর সংকটকালীন পর্যায় (ক্রিটিক্যাল ফেজ) অনেক সময় জ্বর কমার সময়ই শুরু হয়, আর পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। তাই তখনো চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে এবং রোগীর ওপর কড়া নজর রাখতে হবে।
ব্যক্তি থেকে সমাজে: সমন্বিত লড়াই
আপনার নিজের বাড়ি পরিষ্কার থাকলেও পাশের বাড়ির জমে থাকা পানিতে জন্ম নেওয়া মশা আপনাকে কামড়াতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধ কারও একার দায় নয়, এটি সামাজিক দায়িত্ব। পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আর মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে নাগরিকদের সক্রিয় সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি। কর্তৃপক্ষকেও বছরব্যাপী পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে মশক নিধন চালাতে হবে। কারণ, আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে মশার জন্মানোর সুযোগ কমানোই বেশি কার্যকর।
ডেঙ্গুকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই, দরকার জানা ও মানা। সপ্তাহে মাত্র একটি দিন আধঘণ্টা সময় ঠিক করে নিজের ঘর ও আশপাশ ঘুরে দেখলেই এডিসের বাসা ভেঙে দেওয়া সম্ভব। যে পানির পাত্রটি আজ আমরা উপুড় করব, কাল হয়তো সেটিই একটি পরিবারকে হাসপাতালের করিডর ও মৃত্যুশোক থেকে রক্ষা করবে। এডিসের বাসা আমাদের ঘরেই, তাই লড়াইটাও শুরু হোক ঘর থেকেই।
