Probhat Barta

শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২৬, রাত ৪:৩৩ মিনিট

অনুসরণ করুনঃ

মহান শাসকেরা- বৃহদাংশ: হুমায়ুন কবির

আপনারা জনগণের সেবক বলে চিল্লাতে চিল্লাতে মুখের থুতু গা ঘেঁষে থাকা চাটার দলের হোতাদের, মোতাদের ইস্ত্রি করা শার্ট, পাঞ্জাবিতে ছিটিয়ে সয়লাব করে দেন। বাস্তবতা হচ্ছে, আপনারা বিবেকের দরজায় শক্ত খিল এঁটে শোষক হয়ে ধুমাসে দেশবাসীর উপর অ-শাসন চালিয়ে আসছেন, যাচ্ছেন, আবার ফিরে ফিরে আসছেন। আপনাদের ছত্রছায়ায় জন্ম নেয় পাপিয়ারা, ওনারা, তিনারা, হেতিরা।

আপনাদের ভাল কিছু ভাবার সময় কোথায়! কোন পথে আমজনতার গন্তব্য শেষ হবে, এটা ভাবার সময় নেই আপনাদের! যদি পাপিয়ার, ওনার, তিনার, হেতির আস্তানায় গিয়ে নিষিদ্ধ, নীতিহীন আপ্যায়নের ঘোরে অফুরান সময় না দিতেন, তবে অবশ্যই দীনহীনদের পাশে বসার সময় সুযোগ পেতেন। নিজের দায়িত্বগুলি সঠিকভাবে পালন করতে মন চাইতো- বুঝতেন; কি তাদের চাওয়া, কেমন তাদের প্রত্যাশা, বাসনা। জরুরী ফাইলগুলিতে চোখ বুলিয়ে মনটাকে ফুরফুরে করতে ওদের কাছে আপনাদের যেতেই হবে, যেতে হয়। কামনা/লালসা নামক শব্দগুলি কি আর এমনি এমনি সৃষ্টি হয়েছে! কামনা/লালসা শেষ হয় না- কিভাবে যেন ওরা (নিষ্পেষিতরা) বলে? ও হ্যাঁ, গাণিতিক অথবা জ্যামিতিক হারে কামনা/লালসা বাড়তে থাকে। আগে মাসে একবার যাওয়া হতো। এখন মনে হয় এই রঙ্গিলা মচ্ছবের আড্ডাটাই তো বেশ! সারাবছরই কার্তিক মাস। আপনারা শুধু চাকুরী বাঁচাতে তাড়নায় পরিপূর্ণ মচ্ছব থেকে নিজেকে কোনমতে ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে বের করে অফিস বা মিটিংয়ে আসেন। স্পর্শকাতর অঙ্গটা সারাক্ষণ ধাক্কাতে থাকে- আহারে, কি জ্বালা, কি জ্বালা। জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে ফাইলগুলি সহকারীকে প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়ে ছুটে যান সেই রঙমহলে- নাহলে জ্বালা মিটবে কিভাবে! সহকারী মহোদয়; ‘মানুষ’ এর স্থানে ‘ছাগল’, ‘বিশুদ্ধ পানি’ লেখার সময় তাড়াহুড়ায় বিশুদ্ধের বদলে ‘পাগলা’ লিখে শব্দ পূর্ণ করে বানিয়ে রাখেন ‘পাগলা পানি’। সহকারী ভাবেন, দুস শালা, এতো দেখে শুনে কাজ করে কি হবে? মক্কেল বসে আছে। ওখানে সময় নিয়ে বিচিতে মোটামুটি ধরনের একটা চাপ দিলেই পকেট গরম। শব্দমিলের জটিলতা বড্ড কঠিন। এটা নিয়ে এত ভাবনার কি আছে!

মাঝে মাঝে মহাজনের বুড়ো/আধবুড়ো স্পর্শকাতর অঙ্গটা সাময়িক স্থিতাবস্তায় থাকলে অফিসে আসেন। এসে সহকারীর লেখা প্রতিবেদনে চোখ না বুলিয়েই সহকারী যেসব যায়গায় অঙ্গুলি স্পর্শ করে, সেখানেই খসখস করে দস্তখত করে যান- খসখস খসখস খসখস। বাহ, বেশ কাজ হলো আজ! এতোগুলি ফাইল ছাড়লাম! অনেক বড় মহাজন এবার খুশি হবেনই হবেন, না হয়ে যাবেন কই? কত সুন্দর করে প্রতিবেদন তৈরি করলাম! সহকারী লোকটা পটু আছে বটে। মহাজনের দামি মোবাইল ফোনে সুন্দর মুখটা ভেসে উঠে- রাঙ্গা ঠোঁটের আহবান- স্যার, আজকে একটু সময় দেন না, প্লীজ। আপনি আসলে কি যে ভাল লাগে! নতুন একজনকে এনেছি, সবার আগে আপনাকেই কিন্তু ওর সাথে কথা বলতে হবে স্যার।

যেতে হবে, ভাবতেই আপনাদের শরীরটা ঝিমঝিম করে। মুচকি হেসে অফিসের দরজার বাইরে পা রাখেন। সেই সকাল থেকে গ্রামের বাড়ির পাশের দরিদ্র ব্যক্তি বেঞ্চে বসে আছেন- মহাজনের স্কুল জীবনের বন্ধু। ওখানে চোখ পড়েনা মহাজনের। চোখের সামনে কি কি সব ভেসে উঠছে। কি সুন্দর করেই না আদর করে ওখানে! কি ভাল, কি ভাল- একেবারে স্বর্গসুখসম। ওদেরকে আরেকটু সুবিধার ব্যবস্থা করে দেয়া দরকার। ওদের সুবিধা দিলে আমারও কি কম আসবে- এক্কেবারে জোয়ার এসে যাবে। ‘আমার সোনার বাংলা …………’ গুনগুন করে জাতীয় সঙ্গীত গাইছেন- কিন্তু ফুর্তির স্বপ্নজোয়ারে ভাসতে ভাসতে জাতীয় সঙ্গীতের একটা বিশেষ শব্দের সাথে জযম লাগিয়ে গেয়ে ফেললেন কয়েকটি লাইন। আপনি বুঝতেও পারলেন না, কিন্তু আমরা বুঝে গেছি, কত বড় একটা অন্যায় করলেন, এই অপরাধের ক্ষমা নেই, ক্ষমা নেই। জযম দিয়ে সোনার বাংলাকে ……. বাংলা বানিয়ে ছাড়লেন! সাবাশ!! মহাজন, মহারথীরা। একেই না বলে শাসক বা শোষকের মহত্ত্ব (!) কীর্তিগাঁথা! দেশভক্ত, জনদরদী, মানবতার ফেরিওয়ালা ওরফে ‘হকার’।

জটিল জগতে; বুদ্ধি খাটিয়ে সৎ উদ্দেশ্যে কোন কাজ করবেন, আর ধানি/ছোট এবং তীব্র ঝালযুক্ত মরিচ তাতে নিজ স্বার্থোদ্ধারে ফোঁটা দেবে তখন আপনি প্রশংসার বদলে তিরস্কারই শুনবেন। তাতে আপনার মনটা ভেঙ্গেচুরে জোড়া লাগানোর অযোগ্য হয়ে পড়লেও কারো কিছু আসবে যাবেনা। ধীরে ধীরে আপনার আর কনডমের শেষ পরিণতি হবে একই রকম (প্রমাণিত)। আজিব ব্যাপার, তাই না!

সেই কোন আমলে একজন রিক্সাওয়ালাকে বিনা দোষে চড় মারার দায়ে ওই রিক্সার যাত্রীকে কানের নীচে স্রেফ দুইটা দিয়েছিলেন। সেই রিক্সাওয়ালা এত বছর পরও রিক্সা চালায়, আর আপনাকে দেখলে মহারথীদের পাশ কাঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে, “ভাই, কই যাইবেন?” পক্ষান্তরে, জীবন রক্ষাকারী উপকার করেও কেউ কেউ অনেকের কাছে এখন ‘দূর ছাই’।

ক্যামনে কি, বুঝিনারে ভাই!

৪) সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা সংখ্যাধিক্য কখনও সুশাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারেনা। ন্যায়ের দন্ড যাদের হাতে আমানত হিসাবে অর্পিত, তাঁরা আল্লাহ তায়ালা’র উপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে, ন্যায়বিচারক হলে এবং সার্বিকভাবে সততা ও আদর্শকে ধারন করলেই সমাধান সুনিশ্চিত। অহমিকার ঠেলায় অনেকেই এখন উল্টা পথের যাত্রী। কারো উপদেশ খয়রাত করতে হবে না। স্রেফ নিজের বিবেকটাকে জাগ্রত করে নিজেকে জানা যায়, আমি কে, কি, কেন এবং কোন উদ্দেশ্যে আমায় সৃষ্টি। সঠিক পথটা খুব দুর্গম নয়। এটা ঠিক, উল্টা পথের যাত্রীরা বিবেকটাকে বোঝা মনে করে।

গাধার মতো কিছু লোক সেই বোঝাটাকে বয়ে বেড়াবে আমৃত্যু- তাতে মান্যবরদের দাদা’র কি?

জননেতা, জনদরদীদের কাছে যেতে হলে Dress Code মেনে যেতে হবে। আপনার লুঙ্গি, পাজামা আর কমদামি স্যান্ডেল Not Allowed. সবকিছুতে উন্নতির এত এত সুসজ্জিত ঝকমারি যে, ৯৫% লোকের বাধ্য-ব্যবহৃত পরিচ্ছদ এখন উচ্ছিষ্ট।

সাবাশ উন্নয়ন, সাবাশ উন্নয়কদের সাথে জনতার বিচ্ছিন্নতা।

জ্ঞান ও সত্যকে অন্ধকূপে আটকে রেখে ঔদ্ধত্যকে ভাবা হয় ‘আভিজাত্য’, অরাজকতাকে নাম দেয়া হয় ‘স্বাধীনতা’, ষড়যন্ত্রককে বলা হয় ‘রুপকার’, বাচালকে বলা হয় ‘বুদ্ধিমান’, হন্তারককে ‘বীর’, ধর্ষককে ‘মানবতাবাদী’, পতিতার দালালকে ‘উপদেষ্টা’ আর নির্দয়তাকে বলা হয় বিক্রম, নীতিহীন বাণিজ্য হয়ে গেছে রাজনীতি বা জনসেবা ।

সুশোভিত মোড়কের ভিতর ঔদ্ধত্য, অরাজকতা, নির্দয়তা আর নীতিহীন গন্তব্য চরম বিপথে এটা নিশ্চিত।

নদীমাতৃক সোনার বাংলায় পাহাড় দিয়ে নৌকা না চালিয়ে টলটলে, স্বচ্ছ পানিতে চালালে তলানি ভাঙ্গার আশংকা একেবারে কমে আসবে। যাত্রীদের নিশ্চিত মৃত্যু অনিশ্চিত রয়ে যাবে।

কিছু কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কার্যকরণে বংশ বা রক্ত পরিচয়কে সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেয়া হয়। একটা কিন্তু তাতে থেকেই যায়- “বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং আবু লাহাব একই বংশ এবং একই রক্ত ধারার’- তফাৎ বুঝানোর জন্য দুটি নামই যথেষ্ট, নাকি?

দুঃখ বিলাসী
(হুমায়ুন কবির)

অতৃপ্ত মন নিয়ে দুঃখের খেলা আজীবন দীর্ঘশ্বাস
অবিরাম দুঃখ দুঃখ খেলায় অবসাদহীন প্রতিটি ক্ষণ।

দুঃখে কাঁদে মন-
কলায় কেন ছিলকা থাকে,
আমড়া কেন ছিলতে হয়,
ভিক্ষুক কেন ভিক্ষা মাগে,
গরমে কেন কষ্ট হয়?

দুঃখ জাগে-
ছিঃ, অপরাধ করলেই কি জেলের ভাত খেতে হয়?

লক্ষ (!) সন্তানের আহাজারি-
শুনতে বড় কষ্ট হয়?
না হয়, মারল বোমা, গ্রেনেড, গুলি
মরেনি তো আর আসল জন,
গুটিকয়েক মরেছে যদিও
তাই বলে কি সাজা হতেই হয়!

গুলি করে ঝাঁঝরা বুকে মরেছে না হয় ক’জন লোক,
তাই বলে কি বিদেশ থেকে টেনে এনে পড়াতে হবে ম্যানিলা রোপ!

সাধু বলে ওহে পাগল,
দেখত একটু উল্টা করে, ঘটনাটা তোর বেলাতে-
তোর মনে কি হতো বল?”

About The Author

শেয়ার করুন :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পর্কিত: